1. অন্যরকম
  2. অপরাধ বার্তা
  3. অভিমত
  4. আন্তর্জাতিক সংবাদ
  5. ইতিহাস
  6. এডিটরস' পিক
  7. খেলাধুলা
  8. জাতীয় সংবাদ
  9. টেকসই উন্নয়ন
  10. তথ্য প্রযুক্তি
  11. নির্বাচন বার্তা
  12. প্রতিবেদন
  13. প্রবাস বার্তা
  14. ফিচার
  15. বাণিজ্য ও অর্থনীতি

বিদায় ২০২১, স্বাগত ২০২২!

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : ইবার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম
শনিবার, ১ জানুয়ারি, ২০২২

গতকাল ছিলো ২০২১-এর শেষ দিন। এর আগেরদিন এসএসসি পরীক্ষার ফল ঘোষিত হয়েছে। একই দিন স্কুল পর্যায়ে পাঠ্যবই বিতরণ শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসএসসির ফলাফল ও বই বিতরণ উদ্বোধন করেছেন। নিঃসন্দেহে বছরের শেষ দুটি দিন শিক্ষাক্ষেত্রে আনন্দ ও উৎসবের আমেজ তৈরি করেছে। বলা হয়ে থাকে- ‘শেষ ভালো যার, সব ভালো তার’। কথাটি এক অর্থে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। সারা বছরের সালতামামি করলে প্রায় সবার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে নানা সুখ-দুঃখ ও উত্থান-পতনের ঘটনা পাওয়া যায় কিন্তু শেষ মুহূর্তে যদি ভালো কিছুর অভিজ্ঞতা হয় তখন নিঃসন্দেহে মনটা ভরে যায়।

এই ভালো কিছুর মধ্য দিয়ে পুরো বছরের অপ্রাপ্তি, দুঃখ-কষ্ট অনেকাংশেই ভুলে যাওয়া যায়। আমাদের দেশে অনেক পরিবারের নিকট আত্মীয়দের কেউ না কেউ এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় গড়ে ৯৪.০৮ শতাংশ পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। দুটি বছর করোনার অস্বাভাবিক পরিবেশে অনেক শিক্ষার্থীই ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারেনি। তাদের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষাও অনেকটা অনিশ্চিত ছিল। তবে বছর শেষে করোনা সংক্রমণের গতি কমে আসায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে এসএসসি পরীক্ষাটি নেয়ার ব্যবস্থা করেছে।

এটি মোটেও সহজ কাজ ছিল না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বছর শেষ হওয়ার আগের দিন অন্তত ফল প্রকাশের ব্যবস্থা করতে পেরেছে। নতুন বছরের আনন্দটা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছে। যদিও ৬ শতাংশের মতো শিক্ষার্থী সফল হতে পারেনি কিংবা ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অকৃতকার্যদের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। যারা কৃতকার্য হতে পারেনি তাদের জন্য হয়তো এ বছরের শেষ সময় আর নতুন বছরের শুরুটা আনন্দের হতে পারছে না।

নতুন বছরে তারা নতুন উদ্যমে পড়াশোনা করার উদ্যোগ নিলেই এটি অতিক্রম করতে পারবে বলে বিশ্বাস। তবে যেই ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানের নামের তালিকায় উঠেছে, তাদের বোধ হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় না দেয়াই ভালো। পরীক্ষার বিষয়টি ছাড়া গোটা দেশেই এখন শিশুদের হাতে নতুন বই তুলে দেয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। এটি আনন্দের খবর। শিক্ষার্থীরা নতুন বছরে নতুন বই নিয়ে পড়াশোনা শুরু করবে সেই প্রত্যাশা যেন পূরণ হয়। ওমিক্রন যেন কোনোভাবে বাধা না হয়ে দাঁড়ায় নতুন বছরকে কেন্দ্র করে সে কামনাই থাকল।

২০২১-এর শুরুটি মোটামুটি ভালোই ছিল। ভাবা যায়নি বছরটা করোনার নতুন ঢেউয়ে এভাবে ওলটপালট হয়ে যাবে। মার্চেই করোনার নতুন ধরন- ডেল্টা বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে হানা দিয়েছিল। ২০২০-এর চাইতে ২০২১-এর ডেল্টা ভাইরাস অনেক বেশি আগ্রাসী ছিল। বলা যায়, শহর-গ্রাম নির্বিশেষে করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ওভাবে খুলতেই পারেনি।

অনেক পরিবারই প্রিয় সদস্য অথবা আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কাউকে না কাউকে হারিয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে অনেকে। চিকিৎসার জন্য অনেককে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। এমনকি গ্রামে অনেকেই চিকিৎসা পাওয়ার আগে মারা গেছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে সেটি কেউ ভাবতে পারেনি। ৬ থেকে ৭ মাস ডেল্টা ভাইরাস দেশের ওপর দিয়ে যে তাণ্ডব চালিয়েছে তাতে আমরা যারা বেঁচে আছি এটিই অনেকের কাছে এখন অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে।

দেশের অর্থনীতি এত কিছুর পরও বছর শেষে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি খুঁজে পেয়েছে এটি বিস্ময়কর বলা যায়। অসংখ্য বিপণিবিতান, ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্র ও ছোট-মাঝারি প্রতিষ্ঠান করোনার কারণে বন্ধ থেকেছে দিনের পর দিন। পরিবহন-পর্যটন অনেক দিন বন্ধ থেকেছে। সামগ্রিকভাবে স্বল্প ও নিম্ন আয়ের মানুষদের কর্ম হারাতে হয়েছে। সঞ্চয়ও অনেকের তেমন একটা ছিল না। এ ধরনের পরিস্থিতি শত বছরেও কেউ দেখেনি। এমনকি যুদ্ধকালেও মানুষ কিছু না কিছু কাজ করে আয়-উপার্জন করেছে। কিন্তু করোনার ভয়াবহ অবস্থায় সেটিও অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ রাখতে হয়েছে।

দেশ-সমাজ ও রাজনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। শুধু আমাদের দেশে নয়, সব দেশেই চিত্রটা এ রকম ছিল। আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ সেপ্টেম্বর থেকে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিতে শুধু সন্তুষ্টিই নয়, বিস্ময়ও প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘ এ বছরই বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দান করেছে। এ বছর করোনার ভয়াল গ্রাস যদি না থাকত, তাহলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে আরও বেশি অর্জন নিয়ে এতদিনে আরও উচ্চ অবস্থানে থাকত।

বিগত বছরটি আমাদের জাতীয় জীবনে বেশ তাৎপর্যময় ছিল। একদিকে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী, অন্যদিকে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৫০ বছর উদযাপনের বছর। করোনা এসব উদযাপনের অনেক আয়োজনেই কিছুটা ছন্দপতন ঘটিয়েছে। যেভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল সেভাবে দেশব্যাপী কর্মসূচিগুলো উদযাপন করা সম্ভব ছিল না। তারপরও মার্চে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের শুভেচ্ছায় স্বাধীনতার ৫০ বছর ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বছরের অনুষ্ঠান তাৎপর্যময় হয়ে উঠেছিল।

সেই অনুষ্ঠানকে পণ্ড করতে স্বাধীনতাবিরোধী হেফাজত-জামায়াত ও বিএনপিসহ অনেক অপশক্তিই মাঠে নেমেছিল। তারা ভাস্কর্যবিরোধী প্রচার চালিয়ে দেশে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে চেয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমন ঠেকানোর নামে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও শাল্লাসহ অনেক জায়গায়ই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি সংঘটিত করেছিল।

অপশক্তিরা শুধু এসবেই থেমে থাকেনি। আরও বড় ষড়যন্ত্র এঁটে দেশে দাঙ্গা সৃষ্টি করতে মাঠে নেমেছিল। এর জন্য শারদীয় দুর্গোৎসবকে ব্যবহার করতে দেশব্যাপী তাদের লোকজন প্রস্তুত করেছিল। কুমিল্লায় গভীর রাতে মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ কোরআন গণেশের হাতে রেখে দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির আহ্বান ছড়িয়ে দিয়েছিল। একই সঙ্গে নোয়াখালীর চৌমুহনী, চাঁদপুর, পীরগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

দুর্গোৎসবকে লন্ডভন্ড করে দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যেও বড় ধরনের সংঘাত-সংঘর্ষ সৃষ্টির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ২০২১-এর জন্য এটি ছিল একটি অবিশ্বাস্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উপমহাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনা তাদের সফল হয়নি। তবে দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার এই হীন চক্রান্তের ফলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যে মানসিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে, সেটি কারও পক্ষে সহ্য করা মোটেও সম্ভব নয়।

শারদীয় দুর্গোৎসবের সেই অভিঘাত করোনার অভিঘাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বছরটি সবার জন্য বড় ধরনের শিক্ষা রেখে গেল। সেখান থেকে যদি দেশের গণতান্ত্রিক শক্তি কিছু বুঝে নেয়ার চেষ্টা করে, তাহলেই মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ও স্বাধীনতার ৫০ বছর পালনের প্রকৃত তাৎপর্য এবং করণীয় নির্ধারণ করতে ভুল হওয়ার কথা নয়।

বছরের অন্যতম আলোচিত ইস্যু ছিল বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ দেয়া। সেই দাবি বিএনপি সরকারের কাছে করতেই পারে। দেশের বিচার বিভাগ ও সরকার তাকে বিদেশে চিকিৎসা দেয়ার অনুমতি দেবে কি দেবে না সেটি সরকার এবং বিচার বিভাগের বিষয়। যেহেতু তিনি সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত, তাই বিষয়টি আইন ও বিচারের এখতিয়ারভুক্ত।

তার মুক্তি ও বিদেশে যাওয়া নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এমন কিছু বক্তব্য স্বাধীনতা ও বিজয়ের ৫০ বছরকে উল্লেখ করে দাবি করেছেন যা সব বিবেকবান মানুষকে হতবাক না করে পারেনি। বিএনপির মহাসচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ দাবি করেছেন যে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৭১ সালে বন্দি ছিলেন। আবার তারাই দাবি করছেন তিনি বন্দি ছিলেন কারণ, তিনি ছিলেন প্রথম নারী মুক্তিযোদ্ধা।

বিএনপির মহাসচিব বছরসেরা কৌতুক জাতিকে উপহার দিয়েছিলেন এই বলে যে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৭১-এ তার দুই শিশুপুত্র সন্তানের হাত ধরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন! তার এই বক্তব্য শুনে বাঘা সিদ্দিকী নামে খ্যাত বীর উত্তম কাদের সিদ্দিকী বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় একটি লেখা ‘হায় আল্লাহ, বেগম খালেদা জিয়াও বীর মুক্তিযোদ্ধা’ শিরোনামে লিখেছেন। তার লেখায় কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, “খালেদা জিয়া যদি মুক্তিযোদ্ধা হন, তাহলে আমির আবদুল্লাহ নিয়াজি অথবা রাও ফরমান আলী কিংবা মেজর জেনারেল জামশেদ বলবেন তারাও মুক্তিযোদ্ধা।”

২০২১ সালে জাতি যখন স্বাধীনতা ও বিজয়ের ৫০ বছর পালন করতে গিয়ে ৩০ লাখ মানুষের আত্মাহুতি, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর বেদনার কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছিল, তখন বিএনপি নেতৃবৃন্দ তাদের চেয়ারপারসনকে মুক্তিযোদ্ধা সাজাতে গিয়ে যে কল্পকাহিনি তৈরি করেছে তা তাদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ বলে ধরে নিতে হচ্ছে। বিএনপি তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতাকে নিয়েও যেসব কল্পকাহিনি প্রচার করছে তা একই সূত্রে গাঁথা। বিষয়গুলো ২০২১-এ সবাইকে পীড়া দিয়েছে। এমন কষ্ট ২০২২ সালে পেতে হবে না এটাই আশা।

লেখক: মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী, গবেষক-অধ্যাপক।


সর্বশেষ - রাজনীতি